সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত শ্রী শ্রী মদনগোপাল জিউর আখড়া প্রাঙ্গণে নির্মিত হচ্ছে ১৩ ফুট উচ্চতার সর্ববৃহৎ হনুমান জির প্রতিমা। এই ব্যতিক্রমী ও মহতী উদ্যোগকে ঘিরে ইতোমধ্যেই পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ, ধর্মীয় আবেগ এবং এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি। হনুমান জির পূজা ও মহোৎসব ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তদের মধ্যেও এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আগামী ০১ এপ্রিল (বুধবার) অনুষ্ঠিত হবে পূজা ও মহোৎসব। ৩১ মার্চ (মঙ্গলবার) শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শুরু হবে উৎসবের কার্যক্রম। ০১ এপ্রিল বিভিন্ন ধর্মীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। মূল পূজার দিন সকাল ৯টায় মঙ্গলঘট স্থাপন ও পূজারম্ভ, সকাল ১০টায় অঞ্জলি প্রদান, দিনব্যাপী ভক্তিমূলক সংগীত, গীতা পাঠ ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর দেড়টায় মহাপ্রসাদ বিতরণ এবং সন্ধ্যায় ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
প্রতিমাটি নির্মাণ করছেন খ্যাতনামা প্রতিমা শিল্পী দুলাল পাল। তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘বল্লভ নারায়ণ মৃৎ শিল্পালয়’ প্রায় ৩৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বংশপরম্পরায় প্রতিমা নির্মাণ করে আসছে। বর্তমানে ৭ম প্রজন্ম হিসেবে তাঁরা এই ঐতিহ্যকে শুধু ধরে রাখেননি, বরং আরও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় প্রতিটি প্রতিমা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে—যা বাংলার প্রাচীন মৃৎশিল্প ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
মন্দির কর্তৃপক্ষের মতে, এই বিশাল আকৃতির হনুমান জির প্রতিমাটি কেবল আকারেই নয়, বরং শিল্পের সূক্ষ্মতা, নান্দনিকতা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের দিক থেকেও অনন্য হয়ে উঠছে। প্রতিমার গঠনশৈলীতে ফুটে উঠছে হনুমান জির বলিষ্ঠতা, ভক্তি এবং আত্মনিবেদনের প্রতীকী রূপ। তাঁর হাতে গদা, দৃঢ় দেহভঙ্গি এবং ভক্তিপূর্ণ অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে এটি ভক্তদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়াবে।
হিন্দু ধর্মগ্রন্থ রামায়ণ-এ হনুমান জি এক অসাধারণ চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। তিনি ছিলেন ভগবান শ্রী রামের পরম ভক্ত এবং শক্তি, বুদ্ধি ও সাহসের এক অনন্য প্রতীক। সীতাকে উদ্ধারের জন্য তাঁর লঙ্কা যাত্রা, অগ্নিসংযোগ এবং লক্ষ্মণের প্রাণরক্ষার্থে গন্ধমাদন পর্বত বহন—এসব ঘটনা তাঁকে অমর করে রেখেছে ভক্তদের হৃদয়ে। তাঁর জীবনের মূল শিক্ষা হলো নিঃস্বার্থ ভক্তি, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়ের পথে অটল থাকা—যা আজও সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক।
বাংলার সংস্কৃতিতেও হনুমান জির গভীর প্রভাব রয়েছে। গ্রামীণ বাংলার মন্দির, কীর্তন, যাত্রাপালা এবং রামায়ণভিত্তিক পালাগানে হনুমান চরিত্রটি শক্তি ও ভক্তির প্রতীক হিসেবে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হনুমান জির পূজা মানুষের জীবনে সাহস, সুরক্ষা এবং মানসিক শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
আয়োজকদের ধারণা, সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২৫ হাজারেরও অধিক ভক্তের সমাগম ঘটবে এই দিনে, যা সিলেটের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। এই বিশাল আয়োজনে দাড়িয়াপাড়াতে ভক্তবৃন্দের ঢল সামলানো কঠিন হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তাদের শিকড়, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে জানতে পারবে এবং প্রাচীন প্রতিমা নির্মাণ শিল্প নতুন করে অনুপ্রেরণা পাবে।
সবমিলিয়ে, ভক্তি, ঐতিহ্য, রামায়ণের চিরন্তন শিক্ষা এবং বাংলার সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়ে সিলেটে গড়ে উঠছে এক নতুন ইতিহাস। এই উদ্যোগ কেবল একটি প্রতিমা নির্মাণ নয়—এটি বিশ্বাস, ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক গৌরবের এক জীবন্ত প্রতীক, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.