প্রকাশিত: ৩১ মার্চ, ২০২৬ ১৫:১৬ (রবিবার)
ভূমধ্যসাগরে ১২ যুবকের মৃ ত্যু: ৪ মানবপাচারকারীর বিরুদ্ধে মা ম লা

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দিরাইয়ে দালাল চক্রের চার সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। 

সোমবার (৩০ মার্চ) রাতে দিরাই থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বাসুরী গ্রামের নিহত সুহানুর রহমান এহিয়ার বাবা সালিকুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামালা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন দিরাই থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরী।

মামলায় দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের মৃত আকিব উল্লাহর ছেলে অভিযুক্ত (দালাল) মুজিবুর মিয়া, জগদল গ্রামের মাওলানা ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে ইতালিপ্রবাসী সালেহ আহমেদ, জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাও গ্রামের ছায়েক আহমেদ, ছাতক উপজেলার জসিম মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন কয়েক জন।

দিরাই থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরী জানান, নিহত সুহানুর রহমান এহিয়ার পিতা সালিকুর রহমান দিরাই থানায় চারজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। প্রতারণা করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে গ্রিস পাঠানোর কথা বলে তার ছেলেসহ অন্যান্য যুবকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন বলে মামলায় অভিযোগ করেন তিনি।

দিরাই থানা ওসি এনামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গত শনিবার লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয়ের অভাবে দিরাইয়ের ৬ জনসহ সুনামগঞ্জের ১২ জন যুবক মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয় চক্র।

নিহতরা হলেন—জগন্নাথপুর উপজেলার শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), একই গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ জনি (২৫), পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম) গ্রামের প্রাক্তন শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬) ও ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২)।

জগন্নাথপুরের পাশাপাশি দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের তিনজন মারা যান। তারা হলেন—গ্রামের সাইদ সরদারের ছেলে নূরুজ্জামান ময়না (৩০), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫) ও আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮)। একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ররনারচর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে উপজেলা যুবদলের সদস্য মজিবুর রহমান (৩৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমান এহিয়া (২৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (৩০) মারা যান।

এ ছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিমও মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহত যুবকদের স্বজনরা জানান, ১-৫ মাস আগে তারা লিবিয়া গিয়েছিল। লিবিয়া থেকে তাদেরকে গেইমে তোলে গ্রিসের উদ্দেশে বোটে পাচার করা হচ্ছিল। ১২-১৩ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রত্যেক দালালকে দিতে হয়েছে বলে তারা জানান।

মামলার বাদী নিহত সোহানুর রহমান এহিয়ার বাবা সালিকুর রহমান বলেন, ‘জগদল গ্রামের মাওলানা ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে ইতালিপ্রবাসী সালেহ আহমদের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে ইউরোপ যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে পাঠিয়েছিলাম। গত ২২ মার্চ ছেলের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলছিল আব্বা আমার কষ্ট হচ্ছে। খাবার নেই, পানি নেই। এরপর থেকে আমি দালাল সালেহ আহমদকে ফোন দিলে সে ফোন ধরেনি। আমার ছেলের মৃত্যুর খবর জেনে তাকে একাধিকবার ফোন দিলেও সে এখন পর্যন্ত ফোন রিসিভ করেনি।’

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের কল করা হলেও তাদের মুঠফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

একই অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাটিয়াপুর গ্রামের নিহত মেহেদী হাসান তায়েফের পিতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেকে শিপে নেওয়ার জন্য ১২ লাখ টাকার কন্ট্রাক্ট হয়। ছেলের নিরাপত্তার জন্য আরো এক লাখ টাকা বাড়িয়ে ১৩ লাখ টাকায় কন্ট্রাক্ট করি। কিন্তু দালাল হাওয়ার বোটে তাদেরকে পাঠিয়েছিল। বোটেই খাবার ও পানির অভাবে মারা যায়। আমরা তার বিচার চাই।’