রোগীর আস্থার জায়গা হাসপাতাল। অথচ সেই হাসপাতালের বৈধতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সিলেট নগরীতে বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চলছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। কেউ মেয়াদোত্তীর্ণ অনুমোদন নিয়ে, আবার কেউ কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই নিয়মের বাইরে চালিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকালে জেলা প্রশাসনের এই অভিযান পরিচালনা করেন সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসাইন সজীব।
তিনি জানান, লাইসেন্স না থাকার জন্য মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ অনুযায়ী সিলেট মহানগরীর আম্বরখানা দর্শনদেউড়ী এলাকার সুরমা ভ্যালী হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। অভিযানের সময় লাইসেন্স না থাকার জন্য এবং বিভিন্ন অনিয়মের জন্য ওই হাসপাতালকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সময়ে তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করতে ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। একই অভিযানে সুরমা ভ্যালী ফার্মেসীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করা হয়।
সিলেটের হাওয়াপাড়ায় অবস্থিত ‘সেন্ট্রাল হাসপাতাল’কে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইসঙ্গে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করার কঠোর আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল সিলগালা করার পর সামনে এসেছে এই চিত্র। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, নগরের আরও ১৩টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, রোগীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতের নজরদারি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনার জন্য শুধু চিকিৎসক ও অবকাঠামো থাকলেই হয় না। সরকারি অনুমোদনের জন্য প্রয়োজন নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করা। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য শর্ত। নির্দিষ্ট সময় পরপর লাইসেন্স নবায়নের মাধ্যমে এসব বিষয় যাচাই করা হয়।
১৯৮২ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরি পরিচালনা করা যায় না। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করাও বাধ্যতামূলক। নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নবায়ন ছাড়াই চলছে একাধিক প্রতিষ্ঠান
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, মির্জাজাঙ্গালের ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পর থেকে লাইসেন্স নবায়ন করেনি। এছাড়া রয়েল শিশু হাসপাতাল ও নিরাময় পলি ক্লিনিক ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে, আল-আমিন জেনারেল হাসপাতাল ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, সেন্ট্রাল হাসপাতাল, মডার্ন জেনারেল হাসপাতাল এবং আরোগ্য পলি ক্লিনিক ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে লাইসেন্স নবায়ন করেনি।
অন্যদিকে ফেয়ার হেলথ হাসপাতাল, সুরমা ভ্যালি হাসপাতাল ও মেট্রো মেডিকেয়ার ক্লিনিক ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে এবং ডেল্টা স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও কেয়ার হাসপাতাল ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অনুমোদন ছাড়াই চলছে দুই প্রতিষ্ঠান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনহীন তালিকায় আরও রয়েছে শিবগঞ্জের সিলেট ফেক্টো সেন্টার এবং টুকের বাজারের সিলেট মডেল চক্ষু হাসপাতাল ও ফেকো সেন্টার।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, এই দুটি প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেটের একটি স্বনামধন্য ক্লিনিকের পরিচালক বলেন, লাইসেন্স নবায়নের আবেদন অনেক আগেই করা হয়েছে। আমরা ব্যাংক চালানের মাধ্যমে ফি জমা করেছি। তবে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কাগজপত্র যাচাইয়ের কারণে এখনো নবায়ন সম্পন্ন হয়নি। আমরা নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করছি এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধরনের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা হবে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নারকোটিক্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হয়। পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সময়মতো পাওয়া যায় না। ফলে পরিদর্শন সম্পন্ন না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
এদিকে মালিকদের অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, বর্তমানে সিলেটে ১২টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি এবং দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, সিলেটে শতাধিক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তারা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেই নবায়ন পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনলাইন পোর্টালে আবেদন করে ফি জমা দেওয়ার পর আর পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করেন না। আবেদন করলেই লাইসেন্স নবায়ন হয়ে যায় না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরিদর্শন এবং বিধি অনুযায়ী সব শর্ত পূরণ করার পরই লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ কোনো আবেদন অযৌক্তিকভাবে আটকে রাখে না।
এদিকে সম্প্রতি সিলেটের ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিন। তিনি বলেন, লাইসেন্স ছাড়া কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত তদারকি চলছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই বা নবায়ন করা হয়নি, সেগুলোর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য কাউকে হয়রানি করা নয় বরং রোগীদের নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। তাই সব প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে বৈধতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। নিয়ম অমান্য করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.