প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ২১:০৬ (মঙ্গলবার)
সিলেটে শ্রমিক রিপন হত্যার এজাহারে বহাল ময়নুল রাজনরা

সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বাস হেলপার রিপন আহমদ হত্যা মামলায় চার আসামিকে অব্যাহতির পুলিশের সুপারিশ খারিজ করেছেন আদালত।

বাদীপক্ষের নারাজির শুনানি শেষে সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২ আমলি আদালতের বিচারক সাইফুল ইসলাম পুলিশের দাখিল করা অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদনও গ্রহণ করেননি।

পুলিশের তরফ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা চার আসামি হলেন- সিলেট জেলা পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, আব্দুস সহিদ ও সামছুল হক মানিক।

গত ১০ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণ সুরমা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মফিজুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(এ) ধারায় আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে ওই চার আসামিকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফ উজ্জামান প্রতিবেদনটি অগ্রবর্তী করেন।

মামলার বাদী নিহত রিপনের বাবা ছাবলু মিয়া ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে লিখিত আপত্তি জানান।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সজিব আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গত ১৮ আগস্ট মামলার ধার্য্য তারিখে শোনানী শেষে আদালত এ আদেশ দেন। সোমবার আদেশে কপি তাদের হাতে আসে।

আদালত মামলার এজাহার, তদন্ত কর্মকর্তার অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন এবং ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের লিখিত আপত্তি পর্যালোচনা করেন।

আদালতের আদেশে বলা হয়, এটি একটি হত্যা মামলা। নিহত রিপনের মৃত্যুর ঘটনায় গত ৬ মে দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলাটি করা হয়। মামলায় ময়নুল ইসলামসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়।মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩২৫, ৩০২, ৪২৭, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় করা হয়।

আদালত বলেন, ময়নুল ইসলাম, আলী আকবর রাজন, আব্দুস সহিদ ও সামছুল হকের বিরুদ্ধে এজাহারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, ঘটনাস্থলের স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ তদন্ত কর্মকর্তা পর্যালোচনা করেছেন কি না, প্রতিবেদনে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এছাড়া কোনো সাক্ষীর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে কোনো ব্যাখ্যা নেই।

আদালত মনে করেন, চার আসামি এজাহারনামীয়। তাদের বিরুদ্ধে এজাহারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে। তাই তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তা নির্ধারণে পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ প্রয়োজন। সার্বিক পর্যালোচনায় আদালত বাদীপক্ষের লিখিত আপত্তি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ময়নুল ইসলাম, আলী আকবর রাজন, আব্দুস সহিদ ও সামছুল হক মানিককে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন নামঞ্জুর করেন। ফলে পুলিশের দাখিল করা অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়নি।

গত ২৭ এপ্রিল সিলেট-জগন্নাথপুর রুটের বাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এর জেরে ওইদিন বেলা ২টার দিকে সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে হামলা চালিয়ে বাস ও টিকিট কাউন্টার ভাঙচুর করে মিতালি পরিবহণ ও হবিগঞ্জ এক্সপ্রেসের শ্রমিকরা। মারধরে অন্তত সাত শ্রমিক আহত হন। আহতদের মধ্যে বাস হেলপার রিপন আহমদ ও বাসচালক দেলওয়ার হোসেন ছিলেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ দুজনের মৃত্যু হয়।

এই ঘটনায় রিপনের বাবা ছাবলু মিয়া এবং দেলওয়ারের বাবা আজির উদ্দিন গত ৬ মে দক্ষিণ সুরমা থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা করেন।

রিপন হত্যা মামলায় সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলামকে প্রধান করে ২৯ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করে।

কিন্তু মামলার প্রধান আসামি ময়নুল ইসলাম ও দ্বিতীয় আসামি আলী আকবর রাজনকে নিয়ে পরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়। গত ৫ জুলাই এসএমপির আয়োজিত যানজট নিরসনবিষয়ক একটি মতবিনিময় সভায় তারা উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন এসএমপি কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। তখনও তারা রিপন হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। জামিন ব্যতিরেকেও সরকারি সভায় আসামিদের এমন উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। এ নিয়ে নিহতদের স্বজন ও শ্রমিকদের একটি অংশ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বাদীর অভিযোগ:

গত ১০ জুন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মফিজুর রহমান চার আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। প্রতিবেদনটি ওসি মো. আশরাফ উজ্জামান অগ্রবর্তী করেন। তদন্ত কর্মকর্তা বাদীকে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি বাদিকে জানিয়েছেন বলে জানান। পক্ষান্তরে বাদী ছাবলু মিয়া দাবি করেন, মামলা দায়েরের পর তদন্ত কর্মকর্তা বা থানার ওসি তাকে ফোন করেননি। তিনি নিজে ফোন করলেও তা রিসিভ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন।

এদিকে বাসচালক দেলওয়ার হোসেন হত্যা মামলায় নিহতের বাবা ও মামলার বাদী আজির উদ্দিন পরবর্তীতে আদালতে হলফনামা দেন। হলফনামায় তিনি মামলায় ভুল ব্যক্তিদের আসামি করার কথা জানান। এরপর নিহত দেলওয়ারের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার আদালতে পৃথক একটি দরখাস্ত মামলা করেন।