খেলাধুলা

আধুনিক ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছেন হালান্ড

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ ১৯:৪৬

ফুটবল বিশ্বে এর আগে এসেছেন অসংখ্য কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, ওয়েইন রুনি, রোনালদো নাজারিও, দিয়েগো ম্যারাডোনা কিংবা পেলে। কেউ বল নিয়ন্ত্রণে, কেউ নিখুঁত ফিনিশিংয়ে, কেউ গতিতে, আবার কেউ শারীরিক সামর্থ্যে ছিলেন অনন্য। তবে প্রত্যেকের খেলাতেই ছিল কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা।  

কিন্তু আর্লিং হালান্ড যেন সেই প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিচ্ছেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে—হালান্ড কি সত্যিই একজন সাধারণ মানুষ, নাকি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি কোনো ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারড’ অ্যাথলেট? 

৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের বিস্ফোরক গতি, শক্তিশালী শারীরিক গঠন এবং গোল করার প্রায় যান্ত্রিক দক্ষতা তাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ডে পরিণত করেছে। তবে কেবল জন্মগত প্রতিভা নয়, বরং নিজের শরীর ও জীবনযাপনকে বৈজ্ঞানিকভাবে গড়ে তোলার কারণেই তিনি আজ অন্যদের থেকে আলাদা। 


৬ হাজার ক্যালরির খাদ্যাভ্যাস

বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ ফুটবলারের খাদ্যতালিকায় থাকে প্রোটিন শেক ও নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট। কিন্তু হালান্ডের খাদ্যাভ্যাস অনেকটাই ব্যতিক্রম। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম হোলার তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ক্যালরি গ্রহণ করেন। খাদ্যতালিকায় বিশেষ গুরুত্ব থাকে গরুর হৃদপিণ্ড, কলিজাসহ বিভিন্ন অঙ্গের মাংসে। 

নিজের প্রামাণ্যচিত্র Haaland: The Big Decision-এ তিনি বলেন, অনেকেই এসব খাবার খায় না। কিন্তু আমি আমার শরীরের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে খুবই সচেতন।

পানির ক্ষেত্রেও রয়েছে বাড়তি সতর্কতা। সাধারণ পানি না খেয়ে তিনি বিশেষভাবে পরিশোধিত পানি পান করেন। এছাড়া কাঁচা দুধ, পালং শাক ও কেলের মিশ্রণে তৈরি একটি পানীয় পান করেন, যাকে তিনি মজার ছলে নিজের ‘ম্যাজিক পোশন’ বলে উল্লেখ করেন।

ঘুমই সবচেয়ে বড় অস্ত্র

হালান্ডের বিশ্বাস, একজন ফুটবলারের পারফরম্যান্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ঘুম। তাই প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত দুপুরেও কিছু সময় বিশ্রাম নেন।

মেন্স হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ঘুমানোর প্রায় তিন ঘণ্টা আগে তিনি কমলা রঙের বিশেষ চশমা ব্যবহার করেন, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাব কমিয়ে শরীরে স্বাভাবিকভাবে মেলাটোনিন উৎপাদনে সহায়তা করে। 

এছাড়া ঘুমানোর সময় মুখে বিশেষ টেপ ব্যবহার করেন, যাতে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস বজায় থাকে। এতে অক্সিজেন গ্রহণ আরও কার্যকর হয় এবং গভীর ঘুমে হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সহায়তা করে। ঘুমানোর আগে সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইসও বন্ধ করে দেন তিনি। 

কঠোর অনুশীলন ও আধুনিক রিকভারি

হালান্ডের অনুশীলনের মূল ভিত্তি শক্তি, গতি ও নমনীয়তা। তার সাবেক ক্লাব রেড বুল সালসবুর্গের সাবেক কোচ স্ট্যানিস্লাভ ম্যাসেক জানিয়েছেন, কিশোর বয়সেই হালান্ডের প্রতিদিনের রুটিনে ছিল ৩০০টি পুশ-আপ ও এক হাজার সিট-আপ। পাশাপাশি পাহাড়ি ঢালে স্প্রিন্ট এবং নিয়মিত যোগব্যায়ামও করেন তিনি। 

শুধু অনুশীলন নয়, পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াতেও বিশেষ গুরুত্ব দেন এই স্ট্রাইকার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিররের তথ্য অনুযায়ী, নিজের বাড়িতে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক ক্রায়োথেরাপি চেম্বার স্থাপন করেছেন তিনি। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় শরীরকে রাখার মাধ্যমে ল্যাকটিক অ্যাসিড কমানো, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন হালান্ড, যাতে টানা উচ্চগতির খেলায়ও শরীর সতেজ থাকে। 

মাঠের বাইরেও ভিন্ন এক ব্যক্তিত্ব

শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, মানসিক দিক থেকেও নিজেকে আলাদা করেছেন হালান্ড। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি সবসময় সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি তখন ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম। তাই ভাবলাম, অতিরিক্ত সময় খেলতে পারব না। আমাদের এখনই গোল করতে হবে। 


জ্লাতানের পরামর্শেই লম্বা চুল

মাঠে হালান্ডের আরেকটি পরিচিত দৃশ্য হলো ম্যাচের শেষ দিকে চুলের বাঁধন খুলে দেওয়া। তার লম্বা চুল নিয়েও রয়েছে মজার একটি গল্প।

টেলিভিশন অনুষ্ঠান জেমস কর্ডেনের স্পেশাল শো ‘After with James Corden’-এ হালান্ড জানান, সুইডিশ কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ একবার তাকে বলেছিলেন, ‘কখনো চুল কাটবে না। শক্তি লুকিয়ে আছে চুলেই।’

হালান্ড হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, জ্লাতান আমাকে এ কথা বলেছেন। এখন আমি আর কী করতে পারি? তার কথা তো শুনতেই হবে।

মাত্র ২৫ বছর বয়সেই হালান্ড আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাঠের পারফরম্যান্সের পেছনে রয়েছে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, কঠোর অনুশীলন, পর্যাপ্ত ঘুম, উন্নত ক্রীড়াবিজ্ঞান এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন। এসব কিছুর সমন্বয়েই তিনি আজকের ফুটবলে একজন আদর্শ অ্যাথলেটের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন


বিজ্ঞাপন