ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। নামের পাশে রয়েছে রেকর্ড পাঁচটি বিশ্বকাপ তারকা। কিন্তু এই সাম্বা জাদুকরদেরই বিগত ২৪ বছর ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে এক রহস্যময় এবং নির্মম ‘জুজু’। ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে ‘হেক্সা’ (ষষ্ঠ শিরোপা) মিশনের যে স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা প্রতিবারই থমকে গেছে একই প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে।
ব্রাজিল সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ২০০২ সালে। রোনালদো ঞ্জারিও, রোনালদিনিওদের নিয়ে গড়া স্লেসাওদের সেই সোনালি প্রজন্মের পর আর সোনালি ট্রফির ছোঁয়া পায়নি হলুদ জার্সিধারীরা। ব্যর্থতার এই লম্বা সময়ে বরাবরই ব্রাজিলের শত্রু হয়েছিল একপটি মহাদেশ। আর সেটি হল ইউরোপ মহাদেশ।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২ সালের সেই রাতের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে (কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল বা ফাইনাল) কোনো ইউরোপীয় দেশের বিপক্ষে আর জয়ের মুখ দেখেনি সেলেসাওরা। সর্বশেষ টানা ৫টি বিশ্বকাপেই তারা বিদায় নিয়েছে ইউরোপের দলের কাছে হেরে।
নকআউটে ইউরোপীয় জুজুর সেই ৫টি কালো অধ্যায়:
বিশ্বকাপ আসর রাউন্ড প্রতিপক্ষ ফলাফল (ব্রাজিলের বিদায়)
২০০৬ (জার্মানি) কোয়ার্টার ফাইনাল ফ্রান্স ১-০ গোলে পরাজিত (জিনেদিন জিদানের জাদু)
২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা) কোয়ার্টার ফাইনাল নেদারল্যান্ডস ২-১ গোলে পরাজিত (স্নাইডার ট্র্যাজেডি)
২০১৪ (ব্রাজিল) সেমিফাইনাল জার্মানি ৭-১ গোলে ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক পরাজয়
২০১৮ (রাশিয়া) কোয়ার্টার ফাইনাল বেলজিয়াম ২-১ গোলে পরাজিত
২০২২ (কাতার) কোয়ার্টার ফাইনাল ক্রোয়েশিয়া টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে পরাজিত (নির্ধারিত সময় ১-১)
২০০৬ সালে রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, কাকা, আদ্রিয়ানোদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলের ‘ম্যাজিক কোয়ার্ট্রেট’ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ফ্রান্সের জিনেদিন জিদানের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের সামনে। এরপর ২০১০ সালে দুঙ্গার রক্ষণাত্মক ব্রাজিল ডাচদের কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়।
তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে। নেইমারের ইনজুরি আর থিয়াগো সিলভার নিষেধাজ্ঞার দিনে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় ব্রাজিল, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেই অন্যতম বড় ধাক্কা। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’ কেভিন ডি ব্রুইনাদের কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের কাছে কুপোকাত হয় তিতের দল।
আর সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের জাদুকরী গোলের পরও শেষ মুহূর্তের ভুলে গোল খেয়ে বসা এবং টাইব্রেকারে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেওয়া এই অভিশাপকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।
ইউরোপীয় দলগুলোর সুসংগঠিত ডিফেন্স, শারীরিক ফুটবল এবং ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার সামনে ব্রাজিলিয়ান ‘জোগো বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল বারবার খেই হারিয়ে ফেলেছে। কোনো কোনো ফুটবল পন্ডিতের মতে, ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা নিয়মিত খেললেও, জাতীয় দলের জার্সিতে নকআউটের স্নায়ুচাপ তারা সামলাতে পারছে না।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ডাগআউটে আছেন ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি, যিনি নিজে ইউরোপীয় ফুটবল সফল। আজ শেষ ১৬-র ম্যাচে আর্লিং হলান্ডের নরওয়ের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে এই ২৪ বছরের অভিশাপ ভাঙাই হবে ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। আনচেলত্তির ইউরোপীয় মস্তিস্কই কি পারবে ব্রাজিলকে এই দীর্ঘস্থায়ী জুজু থেকে মুক্ত করতে? উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।
খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন