আন্তর্জাতিক

নেপাল-চীনে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১২৭০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ ৪৭০০

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:০৩

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপাল ও চীনের তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২৭০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৭০০ জনের বেশি। দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে হেলিকপ্টার ও জিপলাইন ব্যবহার করছে নেপাল ও চীন কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৫২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২১৬ জন। 


এছাড়াও নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে রসুয়া জেলার কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনো শত শত শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের কয়েকজন ভূগর্ভস্থ টানেলেও আটকা পড়েছেন।

নেপালী সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের একজন কর্মকর্তা সঞ্জয় কেসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখনও আশা করি ভেতরে কিছু জীবিত ব্যক্তি আছেন। কারণ ভেতরে একটি বড় পাওয়ার হাউস আছে, তাই এটি একটি বিশাল কক্ষ, এবং আমরা মনে করি যে পুরো পাওয়ার হাউসটি প্লাবিত হয়নি।’

এদিকে নিখোঁজদের পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের খবরের আশায় প্রতিদিন সকালে এনডিআরআরএমএ কার্যালয়ের বাইরে জড়ো হচ্ছেন। 

নিখোঁজ এক প্রকৌশলীর ছেলে প্রতীক রানা বলেন, ‘প্রতিদিন আমি আমার বাবাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় এখানে আসি, কিন্তু প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় আমার মনে হয় আমার আশা মিলিয়ে যাচ্ছে… বাবা সবার জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন আমার জীবনের এক অমূল্য অংশ।’


অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে এখন পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ ৫৪১ জন।

ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে
দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে হেলিকপ্টারের পাশাপাশি জিপলাইন ব্যবহার করছে উদ্ধারকারী দল। রাজধানী কাঠমান্ডুতে উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্তে ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা চলছে। তবে অনেক মরদেহ পচে যাওয়ায় শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, বন্যা ও কাদার স্রোতে অন্তত ২২ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমেছে।

২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধর্মরাজ উপ্রেতির হিসাবে, প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগের জায়গায় বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ না করে নিরাপদ স্থানে নতুন বসতি গড়ার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘের হিসাবে, নুওয়াকোট ও রসুয়া জেলায় ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ অবস্থান করছেন।

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজও শুরু করার কথা জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।

জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি নেপালের
ভয়াবহ এই দুর্যোগের জন্য বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো- বিশেষ করে চীন, ভারত ও যুক্তারাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায়ের কথাও তুলেছে নেপাল। 

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে নেপাল।

তিনি দাবি করেন, জলবায়ু সংকটে ভূমিকা সামান্য হলে নেপালের মতো দেশগুলোকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে মারাত্মক খেসারত দিতে হচ্ছে। এরমধ্যে রয়েছে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং চরম পার্বত্য দুর্যোগ।

নেপালি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন এক বৈশ্বিক সংকটের চরম মূল্য দিচ্ছি যা আমরা তৈরি করিনি। দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সহায়তাকে শুধু ‘ত্রাণ’ হিসেবে দেখলে হবে না; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে নেপাল তার কূটনৈতিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হতে পারে।” 

এদিকে নেপালের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। 

কাঠমান্ডুর মতে, শিল্পোন্নত ও শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়া, আকস্মিক বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তাদের আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে।

সূত্র: আলজাজিরা

আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন