স্বাস্থ্য

সরকারি গাড়িতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, হাতেনাতে ধরলেন উপদেষ্টা

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৬

ঠাকুরগাঁওয়ে একটি সরকারি গাড়ি থেকে বিপুল মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় খামারিদের জন্য সরবরাহ করা এসব ওষুধ অনেক দিন ধরে গাড়ির পেছনে ফেলে রাখা ছিল। সময়মতো বিতরণ না করায় ওষুধগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং গঠিত হয়েছে তিন সদস্যের কমিটি।

শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের সার্কিট হাউজ চত্বরে এই ঘটনা ঘটে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে গাড়ি থেকে ওষুধ জব্দ করেন।

জানা গেছে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মৌসুমী আক্তারকে বহনকারী একটি সরকারি গাড়ি সার্কিট হাউজে রাখা ছিল। মতবিনিময় সভা শেষে উপস্থিত খামারিদের অভিযোগের ভিত্তিতে গাড়িটির পেছনের অংশে তল্লাশি চালানো হয়। গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে দেখা যায়, সেখানে সরকারের সরবরাহকৃত বিপুল পরিমাণ ওষুধ মজুত রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ।

জব্দকৃত এসব ওষুধ মূলত প্রান্তিক খামারিদের জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে তা খামারিদের মাঝে বিতরণ না হয়ে দীর্ঘদিন গাড়িতে পড়ে ছিল। ফলে মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং ওষুধগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।

ঘটনার পর গাড়ির চালক মো. জয়নাল আবেদীনকে পুলিশ আটক করে। তবে খামারিরা দাবি করেন, চালক কোনোভাবেই এই ঘটনার মূল দায়ভার নিতে পারেন না। তিনি কেবল নির্দেশনা পালন করেছেন। প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, সরকার যে ওষুধ প্রান্তিক খামারিদের কল্যাণে সরবরাহ করে, তা এভাবে নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। এ ঘটনায় জড়িত কেউ রেহাই পাবে না।


তিনি আরও বলেন, সরকারি সম্পদের এমন অপব্যবহার শুধু দায়িত্বহীনতা নয়, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম ফেরদৌস ওষুধগুলো জব্দ করেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তার জেলা ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং নির্দেশ দেওয়া হয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের বাইরে যেতে পারবেন না।

ঘটনার পরপরই প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জবাইদুল কবিরকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এই কমিটি দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা, মৎস্য অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আবদুর রউফ, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ইজাহার আহম্মেদ, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরাফাত উদ্দিন আহম্মেদ ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মৌসুমী আক্তার।

সভায় অংশ নেওয়া খামারিরা অভিযোগ করেন, সরকারি ওষুধ তাদের সবাইকে দেওয়া হয় না। বরং কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ওষুধ কোম্পানির যোগসাজশ রয়েছে। সরকারি ওষুধ বিতরণ করলে বেসরকারি কোম্পানির বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় এই ওষুধ ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়। ফলে তারা ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

তাদের অভিযোগ, শুধু সংশ্লিষ্ট উপজেলা কর্মকর্তা নয়, জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও এই ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। কারণ জেলার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারেই এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।

জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা মিললে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি ওষুধ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মৌলিক সহায়তা। এই সহায়তা যথাযথভাবে পৌঁছায় না বলেই দেশের অনেক খামারিকে বাজারের চড়া দামে বেসরকারি ওষুধ কিনতে হয়। ফলে একদিকে সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে, অন্যদিকে প্রান্তিক জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনাটি সেই বাস্তবতার একটি উন্মোচিত উদাহরণ।

স্বাস্থ্য থেকে আরো পড়ুন