বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের শক্তির বর্তমান মানচিত্র। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং মরক্কো। এই আট দলের মধ্যে ছয়টি ইউরোপের, একটি দক্ষিণ আমেরিকার এবং একটি আফ্রিকার। সংখ্যার হিসাবে ইউরোপের আধিপত্য স্পষ্ট হলেও, ইউরোপের বাইরে থেকেও দুটি মহাদেশ এখনও শিরোপার দৌড়ে টিকে আছে।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাই সবচেয়ে সমৃদ্ধ। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে প্রতিটি শিরোপাই জিতেছে এই দুই মহাদেশের কোনো না কোনো দেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় দলগুলোর ধারাবাহিকতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা শিরোপা জেতার পর ২০২৬ সালের শেষ আটেও ইউরোপের ছয়টি দলের উপস্থিতি সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
ইউরোপের প্রতিনিধিত্বকারী ছয় দলের প্রত্যেকটির গল্প আলাদা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না হলেও ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার। স্পেন তাদের বল দখলভিত্তিক ফুটবলের ঐতিহ্য ধরে রেখে আবারও শেষ আটে উঠেছে। বেলজিয়াম নতুন প্রজন্ম নিয়ে আরেকটি সুযোগের অপেক্ষায়, নরওয়ে বহু বছরের প্রতীক্ষার পর বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য দেখাচ্ছে, আর সুইজারল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করছে যে সংগঠিত দলগত ফুটবল বড় প্রতিপক্ষকেও চাপে ফেলতে পারে।
ইউরোপের বাইরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে আর্জেন্টিনা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে। সেই জয়ের মাধ্যমে লিওনেল মেসিদের কাঁধে শুধু শিরোপা ধরে রাখার দায়িত্বই নয়, দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে পুরো মহাদেশের প্রত্যাশাও এসে পড়েছে।
অন্যদিকে মরক্কো আবারও প্রমাণ করেছে যে তাদের ২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। কাতারে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়ার পর এবারও তারা কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়ে দেখিয়েছে, আফ্রিকান ফুটবল এখন আর কেবল চমক দেখানোর পর্যায়ে নেই তারা নিয়মিতভাবেই বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য অর্জন করেছে।
শেষ আটের এই চিত্র আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এনেছে। এশিয়া, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ওশেনিয়ার কোনো দল কোয়ার্টার ফাইনালে নেই। ফলে শিরোপার লড়াইয়ে আবারও ইউরোপ প্রাধান্য বিস্তার করেছে। তবে সংখ্যাই সবকিছু নয়। আর্জেন্টিনা ও মরক্কোর উপস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বকাপে ইতিহাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাহস, কৌশল এবং বিশ্বাসও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
শিরোনামে ইউরোপের দখলের কথা থাকলেও বাস্তবতা আরও সূক্ষ্ম। ইউরোপ সংখ্যায় এগিয়ে, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে এখনও টিকে আছে দক্ষিণ আমেরিকার গৌরব এবং আফ্রিকার স্বপ্ন। শেষ পর্যন্ত ট্রফি কার হাতে উঠবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই নতুন ফুটবল মানচিত্র কতটা স্থায়ী হয়ে ওঠে।
খেলাধুলা থেকে আরো পড়ুন