প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ ২০:০৭
সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের কল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, প্রান্তিক কৃষক এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।’
তিনি জানান, বর্তমানে চালু থাকা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, প্রবাসী কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় গুরুদের জন্য বিশেষ কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ডে’র আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে নাগরিকরা একক কার্ড ব্যবহার করে সব সরকারি সুবিধা নিতে পারবেন।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘রাষ্ট্রের দেওয়া এসব সুবিধা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্র ও জনগণ- উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে।’
কৃষিখাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।’
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ থাকা প্রায় ১৩ লাখ প্রান্তিক কৃষকের সুদসহ সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কৃষকরা ইতোমধ্যে এর সুফল পাচ্ছেন।’
আরও পড়ুন: মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা হচ্ছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড চালুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করায় সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কল্যাণমূলক কর্মসূচির বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হওয়া ইতিবাচক লক্ষণ।’ এ জন্য তিনি বিরোধী দলীয় নেতাসহ বিরোধী দলের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচার ও বিদেশি নির্ভরতা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। সেই শক্তির ভিত্তি হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
দেশের অর্থনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কারণেই দেশের অবকাঠামো ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।’
তিনি জানান, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি, ইকোট্যুরিজমসহ বিভিন্ন খাতে পর্যায়ক্রমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়নে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং প্রায় আড়াই লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
তিনি জানান, এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে প্রায় দুই লাখ গাছের চারা রোপণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা এখন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়, বরং দেশের মানুষের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখায় পরিণত হয়েছে।’ পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার করা, ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ এবং বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, ‘সংসদের সব সদস্য ও দেশের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করে একটি বৈষম্যহীন, উগ্রবাদমুক্ত এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।’
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন