প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ২১:১৬
দিল্লি, ঝাড়খন্ডের পর এবার ভারতের পূবাঞ্চলীয় রাজ্যে বিহারে শুরু হয়েছে তীব্র ছাত্র আন্দোলন। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ দুর্নীতি এবং পরীক্ষা পদ্ধতির আকস্মিক পরিবর্তনের অভিযোগে রাজধানী পাটনায় রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) ৭০তম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা এবং শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার (টিআই-৪) অনিয়মকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল এবং সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনতিবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানাচ্ছেন।
একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের (টিআরই-৪) পরীক্ষা দুই ধাপে (প্রিলিমিনারি ও মেইনস) নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন চাকরিপ্রার্থীরা। তারা আগের মতো একক ধাপে পরীক্ষা নেওয়া এবং প্রশ্নফাঁসের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী পাটনার ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানে সমবেত হন। সেখান থেকে তারা মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবং রাজ্যপালের বাসভবন অভিমুখে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রওনা হন। আন্দোলনকারীরা পাটনার গুরুত্বপূর্ণ ডাকবাংলো ক্রসিংয়ে পৌঁছালে পুলিশ তাদের পথরোধ করে।
পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাস্তার ওপর বসানো একাধিক নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে জলকামান ব্যবহার করে।
পুলিশের তাড়া খেয়ে আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও পানির বোতল ছুড়ে মারে। পুলিশের লাঠিচার্জে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এবং ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
সংঘর্ষের পর পাটনার জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা কে. এস. অনুপম সংবাদমাধ্যমকে জানান, ব্যারিকেড ভেঙে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় পুলিশ হালকা বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। যেকোনো যৌক্তিক দাবি মূল্যায়নের জন্য সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের লাগাতার বিক্ষোভ ও ক্ষোভের মুখে ‘মাসিক বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’ চালুর কথা ঘোষণা দিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী জানান, প্রতি মাসের চতুর্থ মঙ্গলবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই শিবির অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি তাদের অভিযোগ জমা দিতে পারবেন এবং অনলাইন পোর্টাল ও হেল্পলাইন নম্বর ১১০০-এর মাধ্যমে তা ট্র্যাকিং করতে পারবেন।
এদিকে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলনেতা তেজস্বী যাদব। ইতোমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীকে একটি কড়া চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি।
চিঠিতে তেজস্বী লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর দাবিকে এভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না— উল্লেখ করে অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এক ধাপে নেওয়া, বিপিএসসি মেইনস পরীক্ষা ও ইন্টারভিউতে হিন্দিভাষী পরীক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য বন্ধ করা এবং আগের সব প্রশ্নফাঁসের ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্তের জোর দাবি তুলেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ঝাড়খণ্ড ও দিল্লির পর এবার বিহারের এই ঘটনা ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে আবারও বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল মিলছে না।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, বিহারের এই সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে, দেশের তরুণ সমাজ ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা চরমভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই আন্দোলন বিহারের বাইরেও অন্যান্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি, নিউজ১৮
আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন