প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৪৬
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রতিদিন গণনা করা হবে। দানের টাকার ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়কাজে জন্য ব্যাংকের একাউন্টে জমা রাখা হবে আর বাকী ৬৫ শতাংশ দিয়ে টাকা মাজারের দৈনদিন ব্যয় ও কর্মচারীদের বেতন নির্বাহ করা হবে।
মঙ্গলবার রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। এরফলে শাহজালাল মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রায় দুই মাসের সিদ্ধান্তহীনতার অবসান হলো।
মিটিং শেষে এসব তথ্য জানান এই কমিটির সদসম্য সচিব জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
তিনি জানান, এখন থেকে শাহজালাল মাজারের দানের টাকা প্রতিদিন গণনা করা হবে। দানের টাকা থেকে ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়কাজে জন্য সোনালী ব্যাংকের একাউন্টে জমা রাখা হবে।এই একাউন্ট সিলেটের জেলা প্রশাসক ও মাজারের মতোয়াল্লির যৌথ সাক্ষরে পরিচালিত হবে। বাকী ৬৫ শতাংশ টাকা মাজারের দৈনদিন ব্যয় ও কর্মচারীদের বেতন নির্বাহ করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, টাকা গণনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মাজার কমিটির পক্ষে একজন ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন বা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হবেন। এছাড়া একজন হিসাব রক্ষক ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়া হবে।
মাজার পরিচালনায় একটি কমিটি গঠন করা হবে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কমিটির সদস্য হবেন সাতজন। এর আহ্বায়ক হবেন জেলা প্রশাসক। কমিটিতে সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ, সিলেট জেলা পরিষদের একজন করে প্রতিনিধি ও পুলিশ সুপার থাকবেন। আর মাজারের মতোয়াল্লি এই কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন। এছাড়া নিয়োগকৃত ম্যানেজার এই কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। এই কমিটি মাজারের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিষয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
জরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্সের টাকা নিয়ে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগ ও এ নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এক মাসের মধ্যে কমিটি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি যৌক্তিক ও সমন্বিত কাঠামোর সুপারিশ দেবে বলে সেদিন জানানো হয়েছিল। তবে প্রায় আড়াই মাস পর এই কমিটি সিদ্ধান্তে পৌছে।
এতোদিন কোন নীতিমালা ন না হওয়ায় বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগের পর থেকে মাজারের টাকা প্রকাশ্যে গণনা হচ্ছে এবং গণনার পর টাকা জেলা প্রশাসনের খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হচ্ছে। এতে মাজার পরিচালনায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে জনোন হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের খাদেমরা।
জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একপাক্ষিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন বিকেলে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগও সিলগালা করা হয়। দানবাক্স ও ডেগ সিলগালার পর জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের পক্ষে-বিপক্ষে সিলেটজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এক পক্ষের দাবি, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে জেলা প্রশাসক কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছেন। অন্যদিকে আরেক পক্ষের অভিযোগ, মাজারে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার নামে তার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ছিল একতরফা ও জোরপূর্বক, যা মাজারকেন্দ্রিক প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। এর পরদিন তার উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালার চার দিন পর জনসমক্ষে বাক্সের তালা খুলে টাকা গণনা করা হয়।
গত ২২ জুন প্রথম দফায় দানবাক্স থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার চেক যুক্ত হলে মোট অর্থ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এর ১৮ দিন পর ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও স্বর্ণ-রূপাও পাওয়া যায়। সর্বশেষ ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় দানবাক্স ও মানতের ডেগ খুলে ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা পাওয়া যায়। এ সময় দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি সোনা-রূপার অলঙ্কারও পাওয়া যায়। সবশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। এদিনও দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি সোনা-রূপার অলঙ্কারও পাওয়া যায়।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন