দেশের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দান হিসেবে আসা অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেটের জেলা প্রশাসন থেকে মাজারে আসা টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের দানের সুনির্দিষ্ট হিসেব না রাখা ও আয়-ব্যয়ের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকার অভিযোগ তোলার পর বিভিন্ন পক্ষ থেকে নানা বক্তব্য আসছে।
শুক্রবার (২৪ জুন) সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শন করে অভিযোগ করেছিলেন যে, কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খরচ করেন। যদিও মাজার ব্যবস্থাপনায় জড়িত খাদেমরা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এসব বিতর্কের মধ্যেই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ডেগ বা বড় পাতিল সিলগালা করা হয়, আরেকটি দানবাক্সও বসানো হয়। আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে।
এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসককে বদলির ঘটনাও ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। যদিও তার বদলির সঙ্গে এর আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি-না তা নিশ্চিত নয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন বলছেন, সম্প্রতি একটি একাউন্ট খোলা হয়েছে এবং এখন থেকে মাজারের টাকা একটি ব্যাংক হিসেবে রাখা হবে।
এসব ঘটনার মধ্যেই মাজারকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পক্ষ-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আসছে। একপক্ষ বলছে, মাজারে আসা 'বিপুল পরিমাণ দান' কিছু ব্যক্তি ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। আবার মাজার ব্যবস্থাপনায় থাকা খাদেমরা বলছেন, এটি খাদেমদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ। ফলে তারাই আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা করেন এবং তারা মনে করেন প্রশাসনের এখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। কিন্তু এসব আলোচনার মধ্যেই এ প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে যে, মাজারের টাকা আসলে যায় কোথায়?
আলোচনায় মাজারের টাকা
হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে এবারই প্রথম দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে গণনার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন। সোমবার (২২ জুন) এই গণনায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা আর কিছু বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে।
এর আগে ১৮ জুন মাজারে দানের জন্য ব্যবহৃত বড় তিনটি ডেগ বা পাতিল সিলগালা করে দেওয়া হয়, যাতে দানের টাকা বের করা না যায়। সেই সঙ্গে নতুন দানবাক্স বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন। ফলে চার দিনে সাড়ে সতের লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারে আসলে কী পরিমাণ অর্থ দান বা লোকজনের মানত থেকে আসে সেই আলোচনা জোরদার হয়ে ওঠে।
শাহজালালের মাজারের একজন খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, ’২৭ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় আমরা মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করছি। হযরত শাহজালালের সাথে আসা সঙ্গীদের পরিবারের উত্তরাধিকার আমরা। এই দরগা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়। মাজারের দান আমরা এখানকার মেহমানদের সেবা আর ব্যবস্থাপনাতেই ব্যয় হয়’।
‘এখানকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা থাকলে পরিচালনা কমিটি, সিলেটের দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি ও মাজারের খাদেম পরিবারগুলো নিয়ে বসে কথা বলা যায়। কিন্তু আমরা তা দেখছি না।’ বলেন রায়হান উদ্দিন।
মাজারের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত খাদেম এবং সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব শাহজালাল (রহ.) প্রায় ৭০০ বছর আগে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সিলেটে এসে ধর্মপ্রচার করেছিলেন।
প্রচলিত রয়েছে যে, শাহজালাল অবিবাহিত ছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গীরা পরিবারসহই সেখানে বাস করতেন। ফলে তখন থেকেই অনেকে নানা উপঢৌকন নিয়ে দরগায় আসতো, যা শাহজালাল এসব পরিবারের মধ্যে বিতরণ করতেন।
এসব পরিবারগুলোই মূলত শাহজালালের দরগার খাদেম বা সেবক হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে এসব পরিবারগুলো বড় বড় হতে এখন প্রায় ৩০০ পরিবার রয়েছে।
সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন আব্দুল করিম। তিনি বলছেন, দরগাহর আশেপাশের হোটেল রেস্তোরাঁ হওয়ার আগে শত শত বছর এই দরগায় আগতদের খাদেম পরিবারগুলোই দেখাশোনা করত। সেই ধারাই চলমান আছে।
মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্নার দাবি, মাজারে যেই অর্থ আসে সেটি মাজার ব্যবস্থাপনাতেই তারা ব্যয় করে আসছিলেন।
‘৩০/৪০ জন চৌকিদার আছে। প্রতিদিন মাজারের লঙ্ঘর খানায় বহু মানুষ খাওয়া দাওয়া করে। রোজার সময় প্রতিদিন গণইফতারে অংশ নেয় অসংখ্য মানুষ। বার্ষিক ওরশ আয়োজনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। দরগার ভেতরে চার তলা মসজিদ করা হয়েছে। নতুন ভবন করা হয়েছে। এগুলো সরকার করে না। এগুলো মাজারের অর্থ থেকেই হয়’, বলছিলেন মুফতি রায়হান।
রায়হান জানান, প্রতিদিনকার তত্ত্বাবধান খরচ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, ইমাম মুয়াজ্জিনের বেতন- সব কিছুই মাজারের আয় থেকেই ব্যয় হয়।
আব্দুল করিম বলছেন, দরগার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একেকটি খাদেম পরিবার একেক দিন মাজার পরিচালনা করে। তিনি বলেন, ‘এখন ৩০০ পরিবার আছে। একটি পরিবার বছরে এক দিন দায়িত্ব পালন করে। তারা দিনের আয়ের একটি অংশ মাজার অফিসে দেয়। বাকিটা তারা নেয়। এই টাকা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তাদের আইনি অধিকার।’
যদিও মাজার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সরকার কিংবা সিটি করপোরেশন থেকেও বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় করা হয়।
শাহপরাণসহ অন্য মাজারের টাকা কী হয়
দেশে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দান বাক্সে আসা টাকা গণনা প্রায়শই সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়। মূলত এর তত্ত্বাবধান করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু প্রচুর অর্থ দান হতে দেখা যায় এমন মাজারগুলোর অনেক গুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনা মাজার সংশ্লিষ্টদের হাতেই থাকে।
তবে সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক কার্যালয় থেকে সব মাজার, মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহ গুলোকে ওয়াকফ হিসেবে নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
এখন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শাহজালালের মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও শাহপরানের মাজারের বিষয়ে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনও জানা যায়নি। যদিও স্থানীয়রা বলছেন, মাজারটি ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে ওয়াকফ নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তবে দেশের বহু জায়গাতেই মাজারগুলো ওয়াকফ সম্পত্তি হলেও এগুলোতে আসলে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে না। ফলে আয় ব্যয় কিংবা ব্যবস্থাপনায় খাদেম ও পরিচালনা কমিটিই তদারক করে থাকে।
বাগেরহাটের খান জাহান আলী মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলামের কাছে ‘মাজারের টাকা কোথায় যায়- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেন, ‘এখানে পরিচালনা কমিটি আছে। এর বাইরে আমার আর কিছু বলার নেই’। স্থানীয় জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে এই কমিটির সভাপতি।
যদিও এসব মাজারে নগদ টাকা ছাড়াও লোকজন গরু ছাগল মুরগী দান করার পর সেগুলোর ব্যবস্থাপনা কী হবে তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। স্থানীয় প্রশাসনও ‘স্পর্শকাতর’ বিবেচনায় এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী হয় না।
পটুয়াখালী মির্জাগঞ্জের ইয়ারউদ্দিন খলিফার মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদ মল্লিক বলেন, সারাদেশে আমাদের ৩৫ থেকে ৪০ হাজার দানবাক্স আছে। মানুষের করা দান বা মানতই এখানকার আয়ের প্রধান উৎস। এছাড়া বাৎসরিক ওরসের সময় বেশি দান পাওয়া যায়।
এভাবে বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা দান পাওয়া যায়। নব্বইয়ের দশকে এই মাজার পুরোপুরি ওয়াক্ফ এস্টেটের আওতায় নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি মাজার কমিটি এই মাজার ব্যবস্থাপনা করে থাকে।
সেই কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদ মল্লিক জানান, এই মাজারে মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে। যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, মাজারের কর্মচারী, দুস্থ মানুষ মিলিয়ে প্রতিদিন ৫০০ মানুষের তিন বেলা খাবারের আয়োজন করা হয়। এছাড়া মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক ও মাজারের কর্মচারীদের বেতন, উন্নয়ন কাজ এই তহবিল দিয়ে করা হয়।
শাহজালাল ও অন্য সব মাজার কি ওয়াক্ফ সম্পত্তি?
বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, শাহজালাল মাজার তালিকাভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি।
‘বাংলাদেশে যত মাজার, ইদগাহ, কবরস্থান, মসজিদ আছে সবই বাইডিফল্টট ওয়াক্ফ। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী এগুলো ওয়াক্ফ হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে একটা গণবিজ্ঞপ্তিও আমাদের জারি করা আছে,’ বলছিলেন সাফিজ উদ্দিন। তিনি জানান, ওয়াকফ তিন ধরনের- ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, ওয়াক্ফ আলাল আওলাদ ও ব্যবহারিক ওয়াকফ।
কোনো ব্যক্তি যখন কোনো সম্পদের মালিকানা আল্লাহর উদ্দেশে দলিলসহ দান করে দেন তখন সেটি ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, আর কেউ যদি আয়ের একটি অংশ উত্তরসূরিদের জন্য রাখেন সেটি ওয়াকফ আলাল আওলাদ। আর কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন ঈদগাহ, কবরস্থান কিংবা মসজিদ করেন সেগুলো বাই ডিফল্ট ওয়াক্ফ সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে।
সাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, শাহজালালের মাজার এই তিন ক্যাটাগরিতেই ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
প্রসঙ্গত, সরকার ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ওয়াকফ প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। যিনি ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি বা ব্যবস্থাপনাকে মুতওয়াল্লি বলা হয়। তাকে মৌখিকভাবে কিংবা যে চুক্তি বা দলিল অনুযায়ী ওয়াক্ফ করা হয়েছে তার দ্বারা নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেছিলেন, ২০১৪ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত থাকা সম্পত্তির মধ্যে ৮৫ হাজার ৫৭২ একর ভূমি বেহাত হওয়ার একটি হিসাব মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে। সেগুলো উদ্ধারের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ওয়াক্ফ এস্টেট সারাদেশে প্রায় ২২ হাজার। এগুলোর অধীনে জমি আছে চার লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর। - বিবিসি
সিলেট থেকে আরো পড়ুন